রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকার, অতঃপর প্রভাতী আলো; ক্লান্ত বিকেলে ডুবো ডুবো হয়ে হঠাৎ সূর্যের উধাও, চলে এলো রাত। পরদিন পূবাকাশ আবারো রবির বিভায় মুখরিত। বিরামহীনভাবে পৃথিবীতে এভাবেই দিন-রাত্রির পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। যদিও দক্ষিণমেরু এবং উত্তরমেরুতে রাত-দিনের ব্যপ্তির যথেষ্ট ব্যতিক্রমী আচরণ ঘটে। কিন্তু ভূপৃষ্টের অন্যান্য প্রায় সকল স্থানে এভাবেই ঘটছে দিন-রাতের পুনরাবৃত্তি।
মানুষ কৌতূহলপ্রবণ। তারা জানতে চায় জগতটাকে। প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া মধুময় কিংবা বিষাদময় কালকে মানুষ রাখতে চায় স্থায়ী করে। মানুষ চায় জীবনের সবকিছু হোক ক্রমানুসারে সাজানো। এসব ভাবনার ক্রমাগত উন্নতির ফলে একসময় তৈরি হয়ে যায় পঞ্জিকা (Calendar)।
কিন্তু পৃথিবীতে সর্বপ্রথম ঠিক কারা ক্যালেন্ডার তৈরি করেছিলো তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। কারণ প্রাচীন বহু সভ্যতার অনেক নিদর্শন এখনো আবিষ্কৃত হয় নি। তাই নিশ্চিত করে বলা যাবে না তাদের নিজস্ব কোন ক্যালেন্ডার ছিলো কি না। কিন্তু এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত নিদর্শনের ওপর ভিত্তি করে যেসব সভ্যতার নাম আমরা জানি, সেগুলোর অধিকাংশেরই নিজস্ব পঞ্জিকা ছিলো। যদিও প্রথমদিকের পঞ্জিকাগুলো ছিলো বেশ অপূর্ণাঙ্গ। কিন্তু তাদের দেখানো পথে হেঁটে-হেঁটে একসময় পূর্ণাঙ্গ পঞ্জিকার সূচনা ঘটে।
মানুষের কাছে যে প্রাকৃতিক ঘটনাটি প্রথমেই স্পষ্ট হয় সেটা হচ্ছে ‘দিন’, তারপর ‘মাস’। দীর্ঘ গবেষণার পর নির্দিষ্ট হয় বছর। দিবারাত্রির পুনরাবৃত্তি থেকে দিন এবং পৃথিবীর চারদিকে চাঁদের আবর্তনে নির্ধারিত হয় মাস। কিন্তু বছর নিয়ে বেশ গবেষণা চললো। উৎসুক মানুষের কাছে একসময় নির্দিষ্ট হয় বছরের হিসাবও।
দিন (day)
নিজ অক্ষের চারদিকে পৃথিবীর একবার ঘূর্ণন ঘটলে হয় একদিন বা ২৪ ঘন্টা। সাধারণ অর্থে দিন বা সিভিল ডে হলো পর্যায়ক্রমিক দুটি সূর্যোদয়ের মধ্যবর্তী সময়। সূর্যোদয় হতে সূর্যাস্ত দিবাভাগ এবং সূর্যাস্ত হতে সূর্যোদয় রাত্রিভাগ। প্রতীচ্যে গ্রেগরিয়ান বা খ্রিষ্টাব্দ ক্যলেন্ডার অনুযায়ী দিন শুরু হয় রাত ১২:০০ এরপর থেকে এবং শেষ হয় পরবর্তী মধ্যরাত ১২:০০ টায়। রাত ১২:০০ টা থেকে দুপুর ১২:০০ পর্যন্ত সময়কে a.m (ante meridian) এবং দুপুর ১২:০০ টা থেকে রাত ১২:০০ পর্যন্ত সময়কে p.m (post meridian) বলা হয়। পৃথিবীর আহ্নিক গতির জন্যই দিনরাত্রি ঘটে।
মাস (month)
পৃথিবীর চারদিকে চাঁদের একবার ঘূর্ণনকাল। চন্দ্রবছরের ১২ ভাগের ১ ভাগ সময়কে বলা হয় এক চন্দ্রমাস। পরপর দুটি অমাবস্যা বা পুর্ণিমার মধ্যের গড় ব্যবধান হলো একমাস। এটি ২৯.৫৩১ দিন। তাই একটি চন্দ্রমাসের ব্যপ্তি হয় ২৯ বা ৩০ দিন। সৌর বছর ৩৬৫ দিনে হওয়ায় এর মাসগুলো সাধারণত ৩০ বা ৩১ দিনের হয়।
সপ্তাহ (week)
দিন বা মাসের মতো সপ্তাহ কোন প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। মানুষ তার কাজের সুবিধার জন্য মাসকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে। বিশেষ করে ব্যবসার প্রয়োজনে মাসের বিভাজনের ফলেই সপ্তাহের আবির্ভাব। তবে প্রথমদিকে ৭ দিনে এক সপ্তাহ ছিলো না। আফ্রিকায় ৭ দিনে এবং ইনকা সভ্যতায় সপ্তাহ ছিলো ১০ দিনে। প্রাচীন চীনে প্রতি পাঁচদিন পরপর গোসল করার একটা প্রথা ছিলো। তাই সেখানে সপ্তাহ হয়ে যায় ৫ দিনে। কিন্তু কিছুকাল পর তা ১০ দিনে উন্নীত করা হয়। অতঃপর সময়ের ব্যবধানে ৭ দিনই এক সপ্তাহ হিশেবে চূড়ান্ত হয়। খ্রিস্টিয় ১ম শতাব্দীতে আবিষ্কৃত ৭টি গ্রহের নামানুসারে সপ্তাহের সাত দিনের নামকরণ করা হয়। সাত দিনে সপ্তাহ হওয়ার এটি একটি কারণ বলে অনেকেই মনে করেন।
বছর (year)
সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর একটি আবর্তনের সময়কাল। ক্রান্তীয় বা সৌর বছর (tropical or solar year) হলো বিষুবন (equinoxes) বিন্দুসমূহের সাপেক্ষে একটি আবর্তন যার মান ৩৬৫.২৪২২ দিন বা ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড। অর্থাৎ সূর্য দু’বার মহাবিষুব (vernal equinox) অতিক্রম করলে তার মধ্যবর্তী সময়কে ক্রান্তীয় বছর বা বছর বলে। সৌর পঞ্জিকা (civil year) হলো ৩৬৫ টি পূর্ণদিনের সমাহার; যা প্রতি চার বছরে ১ দিন বেড়ে যায়। চন্দ্রবছর হলো ১২টি চন্দ্রমাসের সমাহার ; যার মান ৩৫৪ দিন। তাই চন্দ্রবছর সৌর বছরের তুলনায় ১১দিন কম।
পঞ্জিকা (Calendar)
দিন মাস বা বছর বললেই যে জিনিসটা আমাদের চিত্রকল্পে ভেসে ওঠে তা হলো ক্যালেন্ডার। Calendar শব্দটি একটি ল্যাটিন শব্দ থেকে আগত যার অর্থ ‘অমাবস্যা’। Calendar এর ভিত্তি হলো মহাশূ্ন্যে পৃথিবী, চন্দ্র ও সূর্যের গতিপথ এবং তা থেকে সঠিক সময় নির্ধারণ। কিন্তু এদের কারোরই পর্যায়কাল সমান নয়। তাই ঘটে বিপত্তি। ক্যালেন্ডার সাধারণত তিন ধরণের হয়ে থাকে। চন্দ্র পঞ্জিকা (lunar calendar); সৌর পঞ্জিকা (solar calendar); এবং চন্দ্র-সৌর পঞ্জিকা (luni-solar calendar)।
চন্দ্র পঞ্জিকা (lunar calendar)
চাঁদের ওপর ভিত্তি করে যে পঞ্জিকা প্রণীত হয় তাকে চন্দ্র পঞ্জিকা বলে। চাঁদ পৃথিবীকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণ আবর্তন সম্পন্ন করতে অর্থাৎ একটি নতুন চাঁদ থেকে আরেকটি নতুন চাঁদ হতে যে সময় লাগে তা-ই চন্দ্রমাস। এভাবে ১২ টি মাসের সমাহারে হয় এক চন্দ্র বছর, যা ৩৫৪.৩৭ দিন। যেমন; হিজরি ক্যালেন্ডার।
সৌর পঞ্জিকা (solar calendar)
সূর্যের ওপর ভিত্তি করে প্রণীত পঞ্জিকাকে বলা হয় সৌর পঞ্জিকা। পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণ আবর্তন সম্পন্ন করতে যে সময় লাগে সেই সময়কালই এক সৌর বছর। অর্থাৎ ৩৬৫.২৪২২ দিন। যেমন; গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার, বঙ্গাব্দ ক্যালেন্ডার।
চন্দ্র-সৌর পঞ্জিকা (luni-solar calendar)
চন্দ্র ও সূর্য উভয়ের ওপর ভিত্তি করে প্রণীত পঞ্জিকাকে বলা হয় চন্দ্র-সৌর পঞ্জিকা। এই ধরণের পঞ্জিকায় মাস নির্ধারিত হয় চাঁদের উপর ভিত্তি করে কিন্তু বছর হয় সৌর পঞ্জিকার মতো। চন্দ্র মাসকে ভিত্তি ধরলে প্রতি বছর সৌর পঞ্জিকার সাথে যে ১১ দিনের পার্থক্য ঘটে তা প্রতি দুই বা তিন বছর পরপর অতিরিক্ত একটি চন্দ্রমাস যোগ করে ঠিক রাখা হয়। তাই এটিকে চন্দ্র-সৌর পঞ্জিকা বলা হয়। যেমন; হিব্রু ক্যালেন্ডার, জিউস ক্যালেন্ডার।
ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিলে আমরা দেখতে পাই, প্রাচীন পঞ্জিকাগুলো প্রণীত হয়েছিলো ভৌগলিক অবস্থানের (Geographical Position) ওপর ভিত্তি করে। এবং সেগুলো ছিলো চন্দ্রভিত্তিক। কিন্তু চন্দ্রভিত্তিক পঞ্জিকায় ঋতুর নির্দিষ্টতা বজায় থাকে না। চাষাবাদসহ অন্যান্য কাজে ঘটে যায় বিপত্তি। কারণ মৌসুম সম্পূর্ণ একটা সৌরভিত্তিক প্রাকৃতিক ঘটনা। ফলে মানুষ সৌর বছরের সাথে সাদৃশ্য রেখে সৌর পঞ্জিকা তৈরিতে আগ্রহী হয়।
শীতপ্রধান দেশে একটি নির্দিষ্ট সময়কাল পরপর গরম পড়তো, বন্যায় নীলনদের পানি একটি নির্দিষ্ট সময়কাল পর উপচে পড়তো, বৃক্ষে ফুল-ফল ধরার পুনরাবৃত্তিও ছিলো প্রায় নির্দিষ্ট, আকাশের তারাগুলো নির্দিষ্ট সময় পর পূর্বের অবস্থানে ফিরে আসতো। এভাবে সৌর বছরের ধারণা তৈরি হতে থাকে। প্রাচীন মিসরের রাজধানী মেমফিসের দক্ষিণাকাশে সিরাস (লুব্ধক)-কে দেখা যেতো নীল নদের বন্যার ঠিক পূর্বে। মিসরীরা এটা থেকেই বছর গণনা শুরু করে। একসময় তাদের হাতেই সৌর ক্যালেন্ডারের সূচনা ঘটে। অতঃপর বিভিন্ন পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জনের মাধ্যমে আমরা পাই আধুনিক পঞ্জিকা বা ক্যালেন্ডার।
ধারণা করা হয় প্রাচীন মিসরীয়রা আনুমানিক ৪ হাজার খ্রিস্টপূর্বে সৌর বর্ষের হিসাব শুরু করে। ৩০ দিনে মাস ধরায় ১২ মাসে হয় ৩৬০ দিন। শেষদিকে ৫ দিন যোগ করে ৩৬৫ দিন পূর্ণ করা হতো। কিন্তু সিরাস প্রতি চার বছর পরপর অতিরিক্ত একদিন বেশি সময় নিয়ে তার একটি আবর্তন সম্পন্ন করে যা তারা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলো। ফলে সৌর বছরের সাপেক্ষে প্রতি চার বছরে মিশরীয় পঞ্জিকার এক দিনের পার্থক্য ঘটতে থাকে। এভাবে ১৪৬০ বছরে পার্থক্য হয়ে যায় ৩৬৫ দিন বা এক বছর। যা সৌর বর্ষের সাথে সৌর ভিত্তিক পঞ্জিকার মারাত্মক ব্যবধান সৃষ্টি করে। কিন্তু গবেষণা থেমে থাকে নি। সৌর বছরের সাথে হুবহু ঠিক রেখে পঞ্জিকা সংস্কারের কাজ চলতে থাকে। ২৩৮ খ্রিষ্টপূর্বে টলেমি’র (তৃতীয়) আদেশক্রমে প্রতি চার বছর পরপর মিসরীয় পঞ্জিকায় অতিরিক্ত একদিন যোগ করার প্রচলন ঘটে। অর্থাৎ লিপ ইয়ার বা অধিবর্ষের প্রচলন প্রথম শুরু করে মিসরীয়রাই।
এদিকে মেসোপটেমিয়া সভ্যতায় বেবিলনই প্রথম সৌর ভিত্তিক পঞ্জিকা প্রণয়ন করে। প্রাচীন গ্রীসে মিসরীয় পঞ্জিকাই অনুসৃত হতো। কিন্তু রোমান পঞ্জিকা সেই তুলনায় ছিলো অসম্পূর্ণ। বছরে ১০ টি মাস এবং তা ৩০ বা ৩১ দিন করে মোট ৩০৪ দিন হতো। ৩০৪ দিন শেষে পঞ্জিকায় অতিরিক্ত ৬১ দিন যোগ করে ৩৬৫ দিন পূর্ণ করতে হতো।
জুলিয়ান ক্যালেন্ডার
রোমান পঞ্জিকাকে সংশোধন ও নতুন কাঠামোতে নিয়ে আসেন বিখ্যাত রোমান বীর জুলিয়াস সিজার। ফলে তখন থেকে এটি হয়ে যায় জুলিয়ান ক্যালেন্ডার। সিজারের নির্দেশে আলেকজান্দ্রিয়ার জ্যোতির্বিদ সসিজেনিসের তত্ত্বাবধানে ১ জানুয়ারি ৪৫ খ্রিস্টপূর্ব থেকে যাত্রা করে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার। এই ক্যালেন্ডারে রোমান ১০ মাসের সাথে আরও দুটি মাস যোগ করে ১২ মাস করা হয়। এবং প্রতি চতুর্থ বছরে অতিরিক্ত একদিন যোগ করে সৌর বছরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এরপরও সৌর বর্ষের সাথে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের পার্থক্য ঘটতে থাকে। কারণ প্রকৃতপক্ষে সৌর বছর হলো ৩৬৫ দিন ৫ ঘন্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড সময়কাল। আর জুলিয়ান ক্যালেন্ডার হলো ৩৬৫.২৫ দিন অর্থাৎ ৩৫৬ দিন ৬ ঘণ্টা। তাই প্রতি বছর জুলিয়ান পঞ্জিকার সাথে সৌর বছরের ১১ মিনিট ১৪ সেকেন্ডের ব্যবধান ঘটতে থাকে। যা ১৩০ বছরে ২৪ ঘণ্টা বা ১ দিন এবং ৪০০ বছরে ৩ দিনের পার্থক্য সৃষ্টি করে। ৫২৬ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ানের আদেশক্রমে পুরোহিত ডিওনিসিয়াস জুলিয়ান পঞ্জিকাকে এমনভাবে সংস্কার করেন যাতে এর শুরু হয় যীশুখ্রিস্টের জন্মসন থেকে।
গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার
১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে পোপ গ্রেগরি (ত্রয়োদশ) জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ত্রুটিকে সংশোধন করে প্রণয়ন করেন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। যাকে খ্রিস্টিয়ান ক্যালেন্ডারও বলা হয়। এই ক্যালেন্ডারের প্রণয়ন যদিও ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে হয়েছে কিন্তু এর প্রথম বছর ধরা হয় যীশুর জন্মের চতুর্থ বছরকে। অর্থাৎ ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে এই ক্যালেন্ডারের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে আমরা সৌর ভিত্তিক যে ক্যালেন্ডার ব্যবহার করছি এটিই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। পোপের নির্দেশে ক্রিস্টোফার ফ্লাভিয়াস ও লুইগি ঘিরালডি জুলিয়ান ও জালালি ক্যালেন্ডারকে সামনে রেখে তৈরি করেন নতুন এই ক্যালেন্ডার। লিপইয়ার থাকার পরও প্রতি ৪০০ বছরে ৩ দিন করে যে পার্থক্য হচ্ছিলো তার সমাধানকল্পে ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দের ৪ঠা অক্টোবর বৃহস্পতিবারের পরেরদিন ৫ অক্টোবর না হয়ে ১৫ অক্টোবর শুক্রবার ধার্য করা হয়। এই দশ দিনকে বাদ দিয়ে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারকে সৌর বছরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করা হয়।
আরো নিয়ম করা হয় যে, শততম বছরগুলি ৪ দ্বারা বিভাজ্য হলেও লিপইয়ার হবে না (সাধারণত ৪ দ্বারা বিভাজ্য বছরগুলি লিপইয়ার হয়) বরং তা ৪০০ দ্বারা বিভাজ্য হতে হবে। সে হিশেবে তা হবে প্রতি চার শতাব্দীর প্রথম তিন শতাব্দীর শেষ বছর। যেগুলো লিপইয়ার হওয়ার কথা ছিলো। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বিগত ১৬০০ খ্রিস্টাব্দ ছিলো লিপইয়ার, এটি ৪ ও ৪০০ দ্বারা বিভাজ্য। কিন্তু ১৭০০, ১৮০০ এবং ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দ ৪ দ্বারা বিভাজ্য হলেও ৪০০ দ্বারা বিভাজ্য নয়, তাই এই বছরগুলোতে লিপইয়ার হয় নি। ২০০০ খ্রিস্টাব্দ আবার ঠিকই লিপইয়ার হয়েছে। ২১০০, ২২০০ এবং ২৩০০ খ্রিস্টাব্দ লিপইয়ার হবে না কিন্তু ২৪০০ খ্রিস্টাব্দ হবে লিপইয়ার। এভাবে সৌর বছরের সাথে সৌর ভিত্তিক ক্যালেন্ডারের সৃষ্টি হওয়া পার্থক্যকে দূর করা হচ্ছে।
পোপের এই ক্যালেন্ডার স্পেন ,ফ্রান্স পুর্তগাল ও ইতালি সে বছরই গ্রহণ করে। জার্মানভাষী রোমান ক্যাথলিকরা গ্রহণ করে ১৫৮৩ খ্রিস্টাব্দে। কিন্তু ইউরোপের বাকী অঞ্চলগুলো একে প্রথমদিকে মানতে নারাজ ছিলো। অবশেষে লুথেরিয়ান স্টেইট জার্মান ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে, গ্রেট ব্রিটেন গ্রহণ করে ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে এবং রাশিয়া গ্রহণ করে ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে এসে।
বিংশ শতাব্দীতে এসে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারকে আবারো সংশোধন করতে হয়। কারণ প্রতি ৪০০ বছরে ৩ দিন কমানোর পরও সৌর বছরের সাথে এটির সূক্ষ্ম পার্থক্য ঘটে যায়। প্রতি ৩৪৫০ বছরে পার্থক্য ঘটে আরও একদিনের। এর সমাধানকল্পে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রতি ৪ হাজারতম বছরের লিপইয়ার বাদ দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। যদিও ঐ বছর ৪ এবং ৪০০ উভয় সংখ্যা দ্বারাই বিভাজ্য হবে। এভাবে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে সৌর ক্যালেন্ডারকে সৌর বছরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা হচ্ছে। পোপ কর্তৃক প্রণীত উক্ত ক্যালেন্ডারকে বর্তমানে অনেকে ভূল করে বলি ইংরেজি ক্যালেন্ডার। আসলে এটি গ্রেগরিয়ান বা খ্রিস্টিয়ান ক্যালেন্ডার। যাকে সংক্ষেপে লেখা হয় CE (Christian Era) বা AD (Anno Domini, যার মানে in the year of our lord) এবং খ্রিস্টপূর্বের সময়কালকে বলা হয় BC (Before Christ)।
জালালি ক্যালেন্ডার
পারস্যের উর্বর ও কৃষিভিত্তিক অঞ্চলে চন্দ্র পঞ্জিকার পরিবর্তে সৌরভিত্তিক পঞ্জিকার প্রয়োজন দেখা দেয়। কারণ চন্দ্র পঞ্জিকা ঋতুকে চিহ্নিত করতে অক্ষম। তাই ১০৭৯ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের সেলজুগ সুলতান জালাল উদ্দিন মালিক শাহের নির্দেশে ওমর খৈয়ামসহ বিশিষ্ট জ্যোতির্বিদদের নিয়ে গঠিত একটি কমিটি সুলতানের নামানুসারে জালালি পঞ্জিকার প্রণয়ন করে। এই পঞ্জিকানুসারে বর্ষ গণনা করা হতো মহাবিষুবের দিন থেকে এবং একেকটি ক্রান্তীয় রাশিতে সূর্যের অবস্থানের ভিত্তিতে একেকটি মাস নির্ণয় করা হতো। এজন্য একেকটি মাসের দৈর্ঘ্য ২৯ থেকে ৩২ দিন হয়ে যেতো। ফলে এই বর্ষপঞ্জি কখনো নির্দিষ্ট ঋতু থেকে সরে যেতো না। তাই জালালি বর্ষপঞ্জিকায় কোন অধিবর্ষের প্রয়োজন নাই। দিন ও মাস গণনায় গাণিতিক নিয়মের পরিবর্তে জ্যোতির্বিজ্ঞানের গণনার উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা থেকেও অধিকতর নিখুঁত। বিভিন্ন বছরে মাসের দৈর্ঘ্য বদলে যাওয়া এবং পঞ্জিকার গণনাপ্রক্রিয়ায় বিভিন্ন জটিলতার কারণে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে (১৩০৪ পারস্য অব্দে) জালালি পঞ্জিকাকে অনেকটাই পরিবর্তন করা হয়। বছরের সর্বশেষ মাসটি ছাড়া বাকী ১১ টি মাসের দিন সংখ্যা স্থির করে দেয়া হয় এবং মাসের নামেও আনা হয় পরিবর্তন।
হিজরি ক্যালেন্ডার
হিজরি বর্ষপঞ্জি ইসলামি বা মুসলিম ক্যালেন্ডার হিশেবে পরিচিত। এটি একটি চন্দ্রপঞ্জিকা। হযরত ওমর (রা.) এঁর শাসনকালে ৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে এটি প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু এর গণনা শুরু হয় ৬২২ খ্রিস্টাব্দে হযরত মোহাম্মাদ (সা.) এঁর হিজরতের বছরকে প্রথম বছর ধরে। অর্থাৎ প্রণয়নের বছরই হয়ে যায় ১৭ হিজরি। ঠিক গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে যেরকম প্রণয়নের বছরই হয়েছিলো ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দ। প্রতিদিনের সূর্যাস্তের মাধ্যমে শুরু হয় এর নতুন তারিখ। তবে মাস সম্পূর্ণরূপে চাঁদের উপর নির্ভরশীল। মাসগুলো ২৯ অথবা ৩০ দিনের হয়। অর্থাৎ গড়ে মাসের ব্যপ্তি ২৯.৫ দিনের। ফলে এক চন্দ্রবছরে হয় ৩৫৪ দিন যা সৌর বছরের তুলনায় ১১ দিন কম। এর ফলে প্রতি ৩২ বছরে চন্দ্র ও সৌর ভিত্তিক ক্যালেন্ডারে প্রায় এক বছরের পার্থক্য ঘটে। অর্থাৎ হিজরি ক্যালেন্ডার গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা বা বঙ্গাব্দ থেকে এক বছর এগিয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, রাসুল (সা.) সৌর ভিত্তিক পঞ্জিকানুযায়ী ধরণীতে ছিলেন ৬১ বছর কিন্তু চন্দ্রভিত্তিক পঞ্জিকানুযায়ী ৬৩ বছর।
বাংলা ক্যালেন্ডার
এটি একটি সৌর ভিত্তিক পঞ্জিকা। বাংলা সন মূলে হিজরি সনই। বাংলাদেশ ও ভারতের আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গে পঞ্জিকাটি দীর্ঘদিন থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বঙ্গাব্দের সূচনা সম্পর্কে দুটি মত চালু আছে। প্রথম মতানুযায়ী প্রাচীন বঙ্গদেশের (গৌর) রাজা শশাঙ্ক ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গাব্দ চালু করেছিলেন। এবং দ্বিতীয় মতানুযায়ী সম্রাট আকবরের শাসনামলে এটি প্রণীত হয়েছিলো। আমরা যে বাংলা সন ব্যবহার করে থাকি তা মূলত সম্রাট আকবরের সময়ে প্রণীত হয়। তখন এটি তারিখ-ই-এলাহি নামে পরিচিত ছিলো। চাষাবাদের কাজ ঋতুর সাথে মিল রাখাই ছিলো প্রণয়নের প্রধান উদ্দেশ্য। সেই লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর ইরানী জ্যোতির্বিদ আমীর ফতুল্লাহ সিরাজীকে নির্দেশ দেন নতুন একটা পঞ্জিকা প্রণয়নের জন্য। সে বছর ছিলো ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দ। অর্থাৎ গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা প্রণয়নের মাত্র দু’বছর পরের ঘটনা। সম্রাট আকবরের সিংহাসনে অভিষেকের বছর অর্থাৎ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ এবং ৯৬৩ হিজরিকে ভিত্তি ধরে বঙ্গাব্দ পঞ্জিকাটি প্রণয়ন করা হয়।
বৈশাখকে বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস নির্ধারণ করা হয়। হিজরি সনকে ভিত্তি ধরে বঙ্গাব্দ প্রণীত হলেও এরপর থেকে বছরগুলো সৌরভিত্তিকভাবে নির্ধারিত হয়। বঙ্গাব্দের সাথে ৫৯৩ বছর (১৫৫৬-৯৬৩=৫৯৩) যোগ করলে পাওয়া যায় গ্রেগরিয়ান বর্ষের হিসাব। এই বাংলা সন আমাদের দীর্ঘদিনের এক সুমহান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্মৃতি বহন করছে। সৌরভিত্তিক পঞ্জিকাগুলোকে প্রকৃত সৌর বছরের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করে রাখতে প্রতি চার বছর পরপর এক দিন বাড়াতে হয়। কিন্তু প্রথমদিকে বঙ্গাব্দে সেটা করা হয় হয় নি। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলা একাডেমীর তত্ত্বাবধানে ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এঁর নেতৃত্বে একটি বঙ্গাব্দ সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত কমিটির পরামর্শে প্রতি চতুর্থ বছরের ফাল্গুন মাসে অতিরিক্ত একদিন যুক্ত করা হয়। অর্থাৎ ঐ বছর ফাল্গুন হবে ৩১ দিনে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ এখনো পুরনো নিয়মানুসারে চলছে। তাই তাদের সাথে বাংলাদেশের বঙ্গাব্দে বেশ পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে।
সম্রাট আকবরের সময়কালে এলাহী ক্যালেন্ডারে মাসের প্রতিটি দিনের জন্য ভিন্ন ভিন্ন নাম ছিলো। যা মনে রাখা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তাই সম্রাট শাহজাহান তাঁর ফসলি সনে সেগুলোকে সাপ্তাহিক পদ্ধতিতে রূপান্তর করেন। তিনি একজন পন্ডিতের সহায়তায় ইউরোপে ব্যবহৃত গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকার দিনগুলোর নামানুসারে বঙ্গাব্দেও বারের নাম প্রবর্তন করেন। যেমন, Sun (Sunday) – রবিবার (সূর্য)
Moon (monday) – সোমবার (চাঁদ)
Mars (tuesday/the day of the God namely, Mars) – মঙ্গলবার (মঙ্গল গ্রহ)
Mercury (Wednesday) – বুধবার (বুধ গ্রহ)
Jupitar (thursday) – বৃহস্পতিবার ( বৃহস্পতি গ্রহ)
Venus (friday) – শুক্রবার (শুক্র গ্রহ)
Saturn (saturday) – শনিবার (শনি গ্রহ)।
দিনের নামের মতো মাসের নামগুলোও একসময় পরিবর্তিত হয়। বর্তমানে ব্যবহৃত বঙ্গাব্দ মাসের নামকরণ করা হয়েছে নক্ষত্রমণ্ডলে চন্দ্রের আবর্তনে বিশেষ তারার উপর ভিত্তি করে। ঐতিহ্যগতভাবে সূর্যোদয় থেকে বাংলা দিন গণনার প্রথা থাকলেও ১৪০২ বঙ্গাব্দের পহেলা বৈশাখ থেকে বাংলা একাডেমী এই নিয়ম বাতিল করে গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকার মতো রাত ১২:০০ টায় দিন গণনা শুরুর নিয়ম চালু করে। বর্তমানে বাংলাদেশে তিনটি পঞ্জিকার ব্যবহার চলছে; গ্রেগরিয়ান, হিজরি এবং বঙ্গাব্দ।
মানুষের প্রয়োজনেই একসময় পঞ্জিকার আবির্ভাব হয়। গতিশীল জীবনকে সুবিন্যস্ত করাই হল ক্যালেন্ডারের মূল লক্ষ্য। সেই চার হাজার খ্রিস্টপূর্বে শুরু হওয়া মিসরীয় ক্যালেন্ডার থেকে আজব্দি ক্যালেন্ডারের ব্যবহার চলছে। ক্রমেক্রমে পঞ্জিকাগুলোর বিবর্তন ঘটেছে। মিসরীয় ক্যালেন্ডার, গ্রীক ক্যালেন্ডার, মেসোপটেমীয় ক্যালেন্ডার, রোমান ক্যালেন্ডার, পার্সিয়ান ক্যালেন্ডার, জুলিয়ান ক্যালেন্ডার, মায়া ক্যালেন্ডার, শকাব্দ, জিউস ক্যালেন্ডার, হিব্রু ক্যালেন্ডার, হিজরি ক্যালেন্ডার, বঙ্গাব্দ, জালালি ক্যালেন্ডার, গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারসহ অনেক ক্যালেন্ডারই বিভিন্ন যুগে ব্যবহৃত হয়েছে এবং অনেকগুলো এখনও প্রচলিত আছে।